।।ভারতভাগ্যবিধাতার স্মারকলিপি।।

“অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত, শুনি তব উদার বাণী
হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক মুসলমান খৃস্টানী
পূরব পশ্চিম আসে তব সিংহাসন-পাশে
প্রেমহার হয় গাঁথা।
জনগণ-ঐক্য-বিধায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!

পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থা, যুগ-যুগ ধাবিত যাত্রী।
হে চিরসারথি, তব রথচক্রে মুখরিত পথ দিনরাত্রি।
দারুণ বিপ্লব-মাঝে তব শঙ্খধ্বনি বাজে
সঙ্কটদুঃখত্রাতা।
জনগণপথপরিচায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!”

লেখা শুরু করার আগে, কবিগুরুর এই চির-অমর রচনার কিছু অংশ উদ্ধৃত করার লোভটা সামলাতে ব্যর্থ হলাম বৈকি!
হ্যা, উক্ত পংক্তিগুলি আমাদের জাতীয় স্তব এর অংশ। সেই গান যা হাজার হাজার ভারতীয় দের ভেতর এর সংগ্রামী কে আজও জাগিয়ে তোলে, সেই গান যা আজও নিপীড়িত সমাজকে সাহস যোগায়, নিজের ভাগ্যের কান্ডারী নিজে হতে।

কিন্তু আজ স্বাধীনতার প্রায় ৭০ বছর অতিক্রম করে, আমাদের হয়তো নিজেদের প্রশ্ন করা উচিত যে, আমাদের প্রাতঃস্মরণীয়রা যেরূপ ভারতবর্ষের কল্পনা করে গেছেন, আমরা কি ঠিক সেই ভারতে বাস করছি?
এমন ভারত যেখানে জাতি হয়তো থাকবে, তবে জাতিবিদ্বেষ থাকবে না। এমন এক ভারতবর্ষ যেখানে ধর্ম থাকবে, তবে হয়তো ধর্মের নামে কলহ থাকবে না।
এমন এক ভারতবর্ষ যেখানে বিপ্লব থাকবে তবে তারসাথে একটি অকৃত্রিম স্থিরতা বিরাজ করবে।
উত্তর বোধয় ঋণাত্মক, জাতিপ্রীতি আমাদের একত্রিত করার বদলে হয়তো ঠেলে দিয়েছে পরস্পরের আরো দূরে, কারণ আমরা হয়তো নামের মধ্যে জাতি, কাজের মধ্যে মানুষের যোগ্যতা এবং অর্থের মধ্যে আদর খুঁজতে ব্যাস্ত।
তবে এই ৭০ বছরে যে সব কিছু খারাপ হয়েছে, তা বলা নেহাত-ই বোকামি হবে।
দেশ নিশ্চিত ভাবে অগ্রগামী, কিন্তু হয়তো একটা প্রশ্ন থেকে যায়, সবাই কি এই চলার পথে সমান ভাবে চলছে? অনেকে এই বৈষম্যতার জন্য বোধয় ভারতবর্ষের ‘নেগেটিভ পলিটিক্স’ কে দায়ী করবে আবার অনেকে মানুষের মনোভাব কে দায়ী করবে।
এটা সত্যি যে মানুষের মনোভাব খানিকটা শিথিল বটে, একটা কথার প্রচলন আছে যে, “People deserve government” যে স্থান এর মানুষ যেমন, সেখানের সাময়িক সরকারব্যবস্থা তেমন হবে।
এবার মানুষকে বিবেচনা করতে হবে যে, আমরা কোন পথ বেছে নেব, রাজনৈতিক কলহের মধ্যে প্রগতিকে অন্ধকারে ঠেলে দেব! নাকি নিজের আখের গোছানোটাকে পাশে রেখে, সেই দেশ গড়বো যা আমাদের সকলেরই স্বপ্ন।
প্রতিটি মানুষ তার নিজের ভাগ্যের-বিধাতা, প্রত্যেকেই নিজের কর্মের দ্বারা নিজের ভাগ্য গড়তে সক্ষম, এই ভাবেই হয়তো আমাদের প্রত্যেকের ভিতরেই একটা করে
‘ভারতভাগ্যবিধাতা’ বিরাজমান। এটা এবার আমাদের ঠিক করতে হবে যে আমরা নিজেই নিজের ভাগ্য গড়বো নাকি অন্য কেউ সেটা গড়ে দেবে তার প্রতীক্ষায় থাকবো। শেষ করার বেলা বাকি পংতিগুলি উদ্ধৃত করছি, সেই সুপ্ত ভারতভাগ্যবিধাতার জাগরণের উদ্দেশ্য…

“ঘোরতিমিরঘন নিবিড় নিশীথে পীড়িত মূর্ছিত দেশে
জাগ্রত ছিল তব অবিচল মঙ্গল নতনয়নে অনিমেষে।
দুঃস্বপ্নে আতঙ্কে রক্ষা করিলে অঙ্কে
স্নেহময়ী তুমি মাতা।
জনগণদুঃখত্রায়ক জয় হে ভারতভাগ্যবিধাতা!

রাত্রি প্রভাতিল, উদিল রবিচ্ছবি পূর্ব-উদয়গিরিভালে—
গাহে বিহঙ্গম, পুণ্য সমীরণ নবজীবনরস ঢালে।
তব করুণারুণরাগে নিদ্রিত ভারত জাগে
তব চরণে নত মাথা।
জয় জয় জয় হে, জয় রাজেশ্বর ভারতভাগ্যবিধাতা!
জয় হে, জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয় জয় হে॥”

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s