আলোর আধিপত্য

বঙ্গ সন্তান হওয়ার যে অনেকগুলি সুখ আছে তার মধ্যে, ‘বারো মাসে তেরো পার্বণ’ রীতিটির জন্য আমাদের পূর্বপুরুষদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা তা উচিত বৈকি। আবার এইসবের মধ্যে আলোকসজ্জা নিয়ে বিশেষ ভাবনা চিন্তাও অবাক করার মতো। উৎসব মানেই যে আলো তা আর কাউকে আলাদা করে বলে দিতে হয়না, আর সত্যি তো উৎসব মানেই মানুষের ধনাত্মক শক্তির উপাসনা, শুভ শক্তির আরাধনা এবং সকল অন্ধকারকে দূরে সরিয়ে দেওয়া।
এই আলোর ব্যবহার নিয়ে আবার বাঙালির আলাদা দক্ষতা আছে, এবং তার বেশিরভাগ বাহবা চন্দননগরের শিল্পী রা পেয়ে থাকেন। ছোট থেকেই দেখে আসছি যে দীপাবলি উপলক্ষে বাঙালি যেন বেশি উদ্যোগী স্বাভাবিক ভাবেই সাধারণ বাঙালির কাছে দুর্গা পুজোটা ঘরে উদযাপন করার মতো নয়, সেটার আসল রস-উপভোগ তো হয় বাইরে বেরিয়ে, প্রতিমা পরিদর্শন করে, আপনজনদের সাথে সময় কাটিয়ে। তাই হয়তো আমরা এই দীপাবলি কেই বেছে নিয়েছি নিজের গৃহস্থকে সুসজ্জিতঃ করতে, বেশ একটা ঘরে বসে উদযাপন করার মতো উৎসব।

এই দীপাবলির সবচেয়ে নজরকাড়া ব্যাপার হলো আলোকসজ্জা, মজার ব্যাপার এই যে বঙ্গ-গৃহস্থ এই ব্যাপারে আবার বেশি আগ্রহী, মাটির প্রদীপ-‘চুনি লাইট’ কিংবা হাল-ফ্যাশানের এল.ই. ডি  সবই সমান ভাবে বঙ্গ-গৃহস্থ সাজাতে যোগ্য। এই কটা দিন আলোটা বোধয় স্টাইল-স্টেটমেন্টে পরিণত হয়, পুজোর চাঁদা চাইতে আসা ছোকরার দল কোন বাড়ির বারান্দায় কীরম আলো সভা পাচ্ছে সেটা দেখে বিল এ টাকার অঙ্কটা নির্ধারণ করে অনেকসময় (অন্তত আমার পাড়া তে তাই) সেইভাবে গৃহস্থের একটিমাত্র চুনি বাল্ব তাকে মোটা চাঁদার হাত থেকে বাঁচিয়ে দায়ে আবার অবস্থাপন্ন গৃহস্বামী তার রোশনাই আছন্ন বাড়ির জন্য কিছু প্রশংসা বার্তা এবং একটা ভালোরকম বিল গ্রহণ করেন।

কিন্তু আমার ভীষণ জানতে ইচ্ছা করে এই এত আলোর মেলাতে সেই চুনি বাল্ব গুলোর বৃত্তান্ত কেউ জানতে চায় না কেন?

সারা বছর বাক্সবন্দি হয়ে কোনো আলমারির উপর তারা অপেক্ষায় থাকে কবে দীপাবলি আসবে, কবে আবার তড়িৎ প্রবাহে জ্বলে উঠবে তাদের ফিলামেন্ট। তাদের হিসেবটা সোজা, একটি বছর অপেক্ষা এবং তারপর জ্বলে ওঠা। এই চক্রে তারা নিজেদের মানিয়ে নিয়েছে যেমন মানিয়ে নিয়েছি আমরা, নিজেদের একটি চক্রে আবদ্ধ করে ফেলেছি অনায়াসে।

এত কর্মকান্ড, এত কোলাহল শুধু একটি ছোট্ট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে, আধিপত্য স্থাপনের অধিকার কার? আর এই উত্তর খুঁজতে বলি করছি অসংখ্য মানুষদের।

রাজনৈতিক আধিপত্য হোক কিংবা মানচিত্রে সামান্য বিস্তার করে নিজের শাসনের আধিপত্য, আমরা কোনকিছুই বাদ রাখিনি। আজও যখন চুনি বাল্ব কিনতে বাজার গেছি, দোকানকার সেটাকে খবরের কাগজের মোড়কে মুড়ে দিলো, আবার অকস্মাৎ ভাবেই কাগজে ছিল সিরিয়ায় কিছু শিশুর মৃত্যুর খবর এবং কাশ্মীরে জঙ্গি হানায় শহীদ হওয়া এক সেনা আধিকারিকের খবর।

মনে হলো আচ্ছা ওই বাল্ব গুলোর কাছ থেকে তো কিছু শিখতে পারি আমরা, ওরা কেমন সবাই একসাথে থাকে, জ্বলে আবার ধুলো মাথায় নিয়ে পরের বছরের অপেক্ষা করে। মানুষ হওয়ার এই সামান্য ‘এডভ্যান্টেজ’ টা কি আর উপভোগ করবো না?।।


Bong Cacophony পরিবারের তরফ থেকে সকল পাঠক/পাঠিকাদের জানাই শুভ দীপাবলির আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা।।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s