​আমিই সেই মেয়ে…………………

হ্যাঁ । আমিই সেই মেয়ে, যে ৭ বছর আগে তার মনে ধরেছিল এমন মানুষের সঙ্গে হাত ধরে নিজের বাবা মাকে বিদায় জানিয়ে চলে গিয়েছিল ।

 কী বললেন ? বাবা মা আপত্তি করেনি ? না না কেন করবে ? দরিদ্র পরিবারে মেয়ের যদি একটা হিল্লে হয়ে যায় … সেখানে বাবা মায়ের আপত্তির কী আছে … বরং মা বেশ খুশিই হয়েছিল। 
ছেলেটা কী করত ? ও তো কেন্দ্র সরকারের অধীনে চাকরি করে … হ্যাঁ আজও করে।
কেন ফিরে এসেছি এ বাড়িতে ? বিয়ের পর থেকেই, জানেন, শ্বশুরবাড়ির লোক আমার ওপর খুব অত্যাচার করতে শুরু করেছিল। হয়তো তারা নিজেদের পছন্দের পাত্রী আনতে চেয়েছিলেন … তাঁদের ছেলের সঙ্গে মানানসই। বিয়ের আগে পর্যন্ত কেউ বলেনি আমি খারাপ দেখতে … অথচ বিয়ের পর কী করে যে আমি কুৎসিত হয়ে গেলাম ? … ঘরের কাজ করায় খুব একটা পটু ছিলাম না ঠিকই…  তবু করতে পারতাম।  তাদের মতো না হলেও পারতাম । পড়াশোনায় ভাল ছিলাম …  তবে সেটা ওদের কাছে কোনও যোগ্যতা নয় । 
আমি অনেকবারই আমার বরকে বলেছি, জানেন । বোঝানোর চেষ্টাও করেছি । ফল সেরকম মেলেনি। 

ও বলত,  “মা বাবার ওপরে আমি নই । তুমি মানিয়ে নাও।” 
“আমি কী ভাবে মানাব ? তাতো বল … ”
“আমি জানি না … তবে বাবা মাকে ছেড়ে আমি কোথাও যেতে পারবো না … তোমাকে যে ভাবে হোক মানিয়ে নিতে হবে … ”
এই কথা শোনার পর আমি ওকে বলেছিলাম, “মানিয়ে নিতেই তো এসেছি … কিন্তু তারা যদি আমায় আপন না ভাবেন আমি কী করে তাদের কাছে আপন হব বলে দাও।”
“না পারলে নিজে যা ভাববে করে নাও …”
“আচ্ছা … তোমার হাত ধরে যখন বেরিয়ে এসেছিলাম তখন ভাবিনি তুমি এত সহজে আমার হাতটা ছেড়ে দেবে । কথা ছিল এক সঙ্গে থাকার…  তা কি ভুলে গেলে ?”
“থাকো না একসঙ্গে … আমি কি বারণ করেছি ? কিন্তু বাবা মাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাবো না।”
” তারা যদি আমার ওপর অত্যাচার বন্ধ না করে … তাও না … ?”
“ঐ টুকু মানিয়ে নিতে হবে … ব্যাস।”
“ঐ টুকু হলে কি আমি মানিয়ে নিতাম না ? …  আমি তো আর পারছি না মানাতে । আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।”
“যা ভাল বোঝো …”
“আমি কোথায় যাবো তোমাকে ছাড়া? আমাদের সন্তান তো এখন আমার শরীরে বেড়ে উঠছে … কোথায় যাব আমি ? আমি খুব ক্লান্ত বোধ করছি … আমার বিশ্রাম দরকার । ওরা আমাকে শুয়ে থাকতে দেয় না । শুয়ে থাকলে খেতে দেয় না। আমি তোমাকে ছাড়া কাকে এই সব অভিযোগ করবো।” 
“সব বাজে কথা … মা আমাকে বলেছে … ঠিক , তুমি মায়ের নামে এসব বলবে …।”
“আচ্ছা , বেশ আমাকে আর মাকে ডেকে তুমি আলোচনা করো … ঠিক ভুল নিশ্চয়ই বুঝতে পারব।”
“না আমার এত সময় নেই । অফিসে অনেক চাপ । রোজ রোজ এই অভিযোগ ভাল লাগে না …”
“তাহলে?”
“তাহলে আবার কী! এ সব মানিয়ে নিতে হবে …”
সত্যি বলছি, আমি জানতাম  না, না-খেয়ে কী ভাবে মানিয়ে নেওয়া যায় …।  ইচ্ছে ছিল না তবু মা বাবার গরিব সংসারে আমায় ফিরে আসতে হল … পেটে আমার ৬ মাসের সন্তান।

 মা আমার চেহারা দেখে তার মতো বুঝে নিয়েছে। মা বলল, ” কী হয়েছে তোর ?” 

আমি বললাম, “মা আমি যদি তোমার কাছে থাকি …”

” তা কী করে হবে মা ? তোর ছোট বোন আছে। একটা মাত্র ঘর। বাচ্চা সমেত তুই … কী করে হবে ? আমাদের তো রোজগারও সেরকম নয় তুই তো সব জানিস।”

” মা সব জেনেও তোমার কাছে এসেছি । কেন জান ? আমি বাঁচতে চাই । আমি ওখানে থাকতে পারছি না, মা।”

বাবা বিদ্রোহ করে বসে … “ভালই তো চলছিল ? কী হল আবার ? নিজেই নিজের পথ বেছেছো … এখন এখানে থাকবো বললে তো হবে না … ।”

মনে মনে যেন ভেবেই নিয়েছিলাম ফিরে আসতে হবে। তাই বাবাকে বললাম,”হবে না। তাই না? আচ্ছা। বেশ …।”
আবার শ্বশুরবাড়ি … 
“কী, থাকতে দিল না তো ? জানা ছিল … এ ভাগাড় ছাড়া কোনও ভাগাড়ে জুটবে না … ”
মাথা নিচু করে ঘরে ঢুকলাম । 

বর বলল, “তুমি আমার মুখে কালি মাখিয়ে ছাড়ছো।”

আমি বললাম, “আমার অপরাধ টা কী ? পেটে খাবার না পড়লে কী ভাবে মানিয়ে নেব ? আমার যে খুব খিদে পায় …”
বিয়ের আগে যদি বুঝতাম বিয়ের পর মেয়েদের কোনও চুলোয় জায়গা নেই । তাহলে হয়তো জীবনটা এ রকম হত না … আমার বাচ্চাটাকে তো আমি ফেলতে পারবো না … এই অবস্থায় আমি নিজে কাজের খোঁজে বেরোতেও পারবো না । বাচ্চাটা হওয়া পর্যন্ত আমাকে বাঁচতে হবে । আমার দোষে আমি মরতে পারি…  কিন্তু ওকে মেরে ফেলার অধিকার আমার নেই । আমি তা পারবো না । শুধু সময় গুনছি … কবে সে জন্ম নেবে … সে ছাড়া আমার কাছে কেউ নেই । 
একজন গরিব  বিবাহিত মেয়ের পাশে কেউ থাকে না হয়তো … তাকে এই ভাবেই মানিয়ে নিতে হয় । এই ভাবে মানিয়ে নিতে যারা পারে না … প্রশ্ন তোলে … তাদের ঘোর বিপদ … কাউকে মনের কথা খুলে বলতে গেলে, ভাবে শ্বশুরবাড়ির নিন্দা করছি । নিজের পরমপ্রিয় স্বামীর নিন্দে করছি … কে আমাকে ভালো চোখে দেখবে ?… কেউ কি আছে ? ভগবান বলে যদি কিছু থেকে থাকে সে কেন আমার এত কষ্ট মেনে নিচ্ছে ? ঠাকুর তুমি তো দেখতে পাচ্ছ, কে ঠিক কে ভুল … নাহ … ঠাকুরও নেই …আসলে আমার পাশে কেউই নেই …।
এই ভেবে ভেবে দিন যায় … 
অবশেষে সেই দিন এলো, যে দিন আমার ছেলে হল … ছেলে বলে কথা। শ্বশুরবাড়ির সবার আনন্দ … মায়ের দাম নেই … কিন্তু তার গর্ভজাত সন্তান অমুল্য … বেশ তাই হোক।
তোমরা ভালো থেকো … আমার ছেলেটাকে ভালো রেখো।

আমার আবার খুব খিদে পাচ্ছে … খাবার জোগান দেবার কেউ নেই … আমায় খেটে খেতে হবে… আমায় বাঁচতেই হবে … আমি পারবো ঠিক পারবো …।
আজ আমি না পারলে … আমি হার মানলে আমার মতো যত মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে অত্যাচারিত হচ্ছে,  তাদের কাছে শুধু হেরে যাওয়ার গল্পটাই বড় হয়ে যাবে । 
কাউকে না কাউকে ঘুরে দাঁড়াতে হয় । আমি নয় সেই চেষ্টাই করি । আর একবার মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা …। করেই দেখি না! 
দেখি আমি জিতি নাকি হারি …
সাগরিকা ভট্টাচার্য

৫/৫/২০১৭

Advertisements

2 Comments Add yours

  1. Satyaki says:

    khub bhalo hoay chay

    Like

    1. sagarikabhattacharjee says:

      thank you

      Like

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s